নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজশাহীর তানোরে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ৫০ টিনের ঘর ভেঙে সেখানে তৈরি করা ৪৩ টি ঘর বরাদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজন প্রীতিসহ আত্নীয় করনের অভিযোগ উঠেছে। এঘটনায় ভুক্ত ভোগীদের মাঝে চরম অসন্তোষ, ক্ষোভ ও উত্তেজনা বিরাজ করছে। ঘটনাটি ঘটেছে রাজশাহীর তানোর উপজেলার বাধাইড় ইউপির ভান্ডাইল আশ্রায়ন গুচ্ছো গ্রামে। সরেজমিনে গিয়ে ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, তানোর উপজেলার বাধাইড় ইউপির ভান্ডইল মৌজায় ৮০ নম্বর দাগে ৪ দশমিক ১১ একর আয়তনের একটি পুকুর পাড়ের ৮১ নম্বর দাগে প্রায় ৩৮বিঘা সরকারি খাস সম্পত্তিতে ২০০৭ সালে আশ্রায়ন প্রকল্পের আওতায় টিনের বেড়া দিয়ে ৫০টি ঘর তৈরী করে স্থানীয় ভুমিহীনদের মাঝে দলিল করে বরাদ্দ করা হয়।
আশ্রায়ন প্রকল্পের ঘর পেয়ে স্থানীয় ৫০টি ভূমিহীন দরিদ্র পরিবারকে সমিতির গঠনের মাধ্যমে সেখানে বসবাস করার পাশাপাশি ওই পুকুরটিও তাদের জীবিকার জন্য দেয়া হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম শতবর্ষ উপলক্ষে ২০২২ সালে আশ্রয়ণ প্রকল্পের টিনের ৫০ টি ঘরে ভেঙ্গে সেখানে ৪৩ টি পাঁকা ঘর নির্মান করে ৩৯ টি ঘর বরাদ্ধ দেয়া হলেও ৪টি ঘর বরাদ্ধ দেয়া হয়নি। আশ্রায়ন প্রকল্পের টিনের ঘরে দলিল মুলে দীর্ঘদিন বসবাস করার পরও পাঁকা ঘর বরাদ্ধ না স্থানীয় ভুক্তভোগীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যারা আশ্রায়ন প্রকল্পের টিনের ঘরে বসবাস করেছেন তাদের বেশীর ভাগ ভুমিহীন দরিদ্রদের বাদ দিয়ে নতুন ভাবে তালিকা করে ঘর বরাদ্ধ দেয়া হয়েছে যার বেশীর ভাগ পেয়েছে আশ্রায়ন প্রকল্পের সমিতির সভাপতি আতিকুল ইসলামের আত্নীয় স্বজন।
আশ্রয়ণ প্রকল্পের টিনের ঘরে প্রায় ১৫ বছর ধরে বসবাস করেও পাঁকা ঘর বরাদ্ধ না পাওয়া মৃত শমসের আলীর স্ত্রী সোনাভান (৫৫) নামের এক নারী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আশ্রয়ণ প্রকল্পের সভাপতি আতিকুল ইসলামের নিজের বাড়ি থাকার পরও তার স্ত্রী, পুত্র হৃদয়, ২ ভাই শফিকুল ও জহুরুল ইসালাম এবং শ্যালক ও সমন্দীসহ মামাতো ভাইনখালাতো ভাই মিলে তার প্রায় ২০ জন আত্নীয়ের নামে পাঁকা ঘর বরাদ্ধ দেয়া হয়েছে। অথচ আমাকে ঘর দেয়া হয়নি। তিনি বলেন, পুরনো ঘর ভেঙে নতুন ঘর নির্মাণ হওয়ার কারণে তিনি অন্যের জমিতে (কবরস্থান) অস্থায়ী ভাবে ঝুপড়ি ঘর তৈরি করে সেখানে বসবাস করছেন। তিনি আরো বলেন, অন্যের জমিতে ছোট্ট ঝুপড়ি ঘরেই রোদবৃষ্টিতে দিনযাপন করছি। অন্যরা যখন একই পরিবারে অনেক গুলো ঘর পাচ্ছেন, সেখানে তার মতো বৃদ্ধার কথা একটি বারও কেউ চিন্তা করলো না।
মৃত জিল্লুর রহমানের স্ত্রী মরিজান বেওয়া বলেন৷ আমার নামেও আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরের রেজিস্ট্রি দলিল থাকলেও আমাকেওকোনো ঘর দেয়া হয়নি। অতি কষ্টে আমিও ঝুপড়ি ঘরে বসবাস করছি। তিনি বলেন, আক্তার আলীর পুত্র শাকিল আলী, জামিলুরের পুত্র সারোয়ার, মৃত রহমানের পুত্র সেকেন্দার আলীর নামে পাঁকা ঘরের তারিকায় নাম থাকা সত্তেও তাদের কোনো ঘর দেয়া হয়নি।
তিনি বলেন, পারুলের বিয়ে হয়েছে উচাডাঙা তার পরেও তার নামে ঘর আছে, আবার রাকিব ও তার মেয়ে রুনার নামে ঘর রয়েছে। অন্যদিকে আকতার বানুর নামের ঘর থাকলেও সেই ঘরে কেউ থাকে না। আশ্রায়ন প্রকল্পের৷ টিনের ঘরে বসবাস করা মেছের আলী বলেন, আমি পাঁকা ঘর পাইনি, তাই রাস্তার ধারে ঝুপড়ি ঘরে বসবাস করছি। নতুন ঘর বরাদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম ও আত্নীয় করণ করা হয়েছে বলেও ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান তিনি।
এদিকে ভুক্তভোগী ও স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, আশ্রয়ণ প্রকল্পের প্রায় ৪ দশমিক ১১ একর আয়তনের বিশাল পুকুরটি নিজেই নিয়ন্ত্রণ করতেই আতিকুল ইসলাম সভাপতি হয়েছেন। ওই পুকুর থেকে বছরে প্রায় ৬ লাখ টাকা থেকে ৭ টাকা আয় করা সম্ভব। আতিকুল ওই পুকুর নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখে আশ্রয়ণের বাসিন্দাদের নামমাত্র সুবিধা দিয়ে পুরো নিয়ন্ত্রন তার নিজের কাছে রেখেছেন। পুকুরের আয় ব্যায়ের হিসাব চাওয়ায় তাদের অনেককেই বাদ দিয়ে নিজের আত্নীয় স্বজনদের নামে নতুন পাঁকা ঘরের বরাদ্ধ দেয়া হয়েছে বলেও জানান ভুক্তভোগীরা। তারা বলছেন এসব অনিয়ম নিয়ে প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছি, কিন্তু প্রশাসন বিষয়টি গুরুত্ব দেয়নি ফলে কোন সুরাহা হয়নি। সুষ্ঠ তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা ও নতুন ভাবে প্রকৃত দরিদ্রদের মাঝে পাঁকা ঘর বরাদ্ধ দেয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ও স্থানীয়রা।
এবিষয়ে জানতে চাইলে আতিকুল ইসলাম বলেন, আমার বাড়ি আছে সত্যি। তবে, সেটা সরকারি খাস জায়গায়।সরকার যদি কখানো তার বাড়ি ভেঙে দেয় তাহলে কোথায় যাবেন ? তাই তিনি পাঁকা ঘর নিয়েছি। ওই ঘরে থাকার পাশাপাশি নিজ বাড়িতেও থাকেন বলেও জানান। তিনি আরো বলেন, আশ্রায়ণের ৩৯টি পরিবার মিলে তারা পুকুর চাষ করছেন তেমন কোন লাভ হয়না। পাঁকা ঘর আপনার আত্নীয় স্বজন বেশীর ভাগ পেয়েছে এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আশ্রায়ন প্রকল্পের শুরু থেকেই টিনের ঘর থাকা অবস্থা থেকেই আমি সমিতির সভাপতি রয়েছি। আমি নামের তারিকা দিয়েছি বরাদ্ধ দিয়েছে প্রশাসন এখানে আমার কি করার আছে জানিয়ে এড়িয়ে যান তিনি।
এব্যাপারে তানোর উপজেলা নির্বাহী অফিসার নাঈমা খান বলেন, যাদের পূর্বের ঘরসহ ৯৯ বছরের লিজ দেওয়া থাকে তাদের নতুন ঘর পাওয়ার কথা। যাদের ঘর বরাদ্ধ দেওয়া হয়েছে তাদের বের করে দেয়া বেআইনি হবে। যদি গৃহহীন থেকে থাকে তাদের বরাদ্ধের জন্য আবেদন করা যেতে পারে। তবে, তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও জানান তিনি।
রিপোর্টারের নাম 












