০৭:৩৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ২ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

বরেন্দ্রর ‘সবুজ বিপ্লব’ ও পানির স্তর রক্ষায় ড. আসাদুজ্জামানের কালজয়ী অবদান

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০১:৩৭:১১ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৫০০ বার পড়া হয়েছে

​মোঃ রবিউল ইসলাম মিনাল:গোদাগাড়ী রাজশাহী জেলা প্রতিনিধি:১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
​শুষ্ক ও অনুর্বর বরেন্দ্র ভূমিকে সুজলা-সুফলা জনপদে রূপান্তরের কারিগর, বিশিষ্ট কৃষি গবেষক এবং বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (BMDA) সাবেক চেয়ারম্যান মরহুম ড. এম. আসাদুজ্জামানের উদ্ভাবনী গবেষণায় বদলে গেছে উত্তরবঙ্গের কৃষি চিত্র। তাঁর প্রতিষ্ঠিত সংস্থা ‘সেন্টার ফর অ্যাকশন রিসার্চ-বরেন্দ্র’ (CARB) বর্তমানে তানোর, গোদাগাড়ী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিস্তীর্ণ এলাকায় ভূ-গর্ভস্থ পানির সুরক্ষা ও টেকসই কৃষি প্রসারে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে।
​পানির স্তর রক্ষায় ‘বরেন্দ্র মডেল’
ড. আসাদুজ্জামান লক্ষ্য করেছিলেন, অনিয়ন্ত্রিত ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে বরেন্দ্র অঞ্চলের পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যাচ্ছে। এই সংকট মোকাবিলায় তিনি ভূ-পরিস্থ পানির (Surface Water) ব্যবহার বৃদ্ধি এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ‘বরেন্দ্র মডেল’ প্রচার করেন। তাঁরই উদ্ভাবিত ‘প্রিপেইড মিটার’ ও ‘স্মার্ট কার্ড ভিত্তিক সেচ ব্যবস্থা’ আজ উত্তরবঙ্গের কৃষকদের সেচ খরচ কমিয়ে সাশ্রয়ী কৃষির পথ দেখিয়েছে।

২০১৫ সাল থেকে কার্ব-এর অধীনে ‘গ্রাউন্ড ওয়াটার মনিটরিং, রিসোর্স অ্যাসেসমেন্ট এন্ড ম্যানেজমেন্ট ইউনিট’ অত্যন্ত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহ করছে। বর্তমানে বরেন্দ্র অঞ্চলের ১৫টি উপজেলার ৩০টি শাখা অফিসের মাধ্যমে প্রতিদিন ভূ-গর্ভস্থ পানির স্থিতিশীল স্তর (Static Water Level) পরিমাপ করা হচ্ছে। এই উপাত্তগুলো আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক কেন রাস্টনের তত্ত্বাবধানে বিশ্লেষণ করে নিয়মিত আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশ করা হচ্ছে।

গোদাগাড়ীর আমতলীসহ বিভিন্ন ডেটা রেকর্ডিং স্টেশনের মাধ্যমে কার্ব যেসব কার্যক্রম পরিচালনা করছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
​গভীর নলকূপের সেচ কার্যক্রমের ফলে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তরের প্রভাব নির্ণয়।
​ফসলের নিবিড়তা ও বৈচিত্র্যতা পর্যবেক্ষণ করে কোন ফসলে কতটুকু পানি প্রয়োজন, সে বিষয়ে কৃষকদের সচেতন করা।
​মাটির ধরন অনুযায়ী উপযোগী ফসল চাষে উৎসাহ প্রদান।
​আবহাওয়া ও আর্দ্রতা পরিমাপের মাধ্যমে সেচ দেওয়ার ‘নিরাপদ পাম্পিং আওয়ার’ নির্ধারণ।

গোদাগাড়ী উপজেলার কেল্লাবারুইপাড়া গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া এই গবেষক বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও পরবর্তীতে পিএইচডি অর্জন করেন। তিনি সাবেক মন্ত্রী ব্যারিস্টার আমিনুল হক ও সাবেক আইজিপি ড. এনামুল হকের ভাই হওয়া সত্ত্বেও নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন বরেন্দ্রর মাটি ও মানুষের কল্যাণে। তাঁরই প্রচেষ্টায় আজ হাজার হাজার একর পতিত জমি ফলদ বাগানে ভরে উঠেছে।
​বর্তমানে ড. আসাদুজ্জামানের রেখে যাওয়া দর্শন ও ‘কার্ব’-এর হাল ধরেছেন সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আব্দুর রকিব এবং অন্যান্য প্রকৌশলীবৃন্দ। বিএমডিএ-এর সহযোগিতায় এই গবেষণা কার্যক্রম বরেন্দ্র অঞ্চলের পরিবেশ ও আর্থ-সামাজিক অবস্থা রক্ষায় এক অনন্য ঢাল হিসেবে কাজ করছে।
​স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে স্থানীয় কৃষকরা জানান, “ড. আসাদুজ্জামান আমাদের শুধু পানি ব্যবহারের নিয়মই শেখাননি, তিনি আমাদের মাটিকে ভালোবাসতে শিখিয়েছেন। তিনি নেই, কিন্তু তাঁর কাজের সুফল আমরা প্রতিদিন ভোগ করছি।
​বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষি ও পরিবেশ রক্ষায় ড. এম. আসাদুজ্জামানের এই অবদান ও ‘কার্ব’-এর চলমান গবেষণা আগামী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও টেকসই আবহাওয়া নিশ্চিত করবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

   রাজশাহী  প্রতিনিধি

মোঃ রবিউল ইসলাম মিনাল
01712483534

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

বরেন্দ্রর ‘সবুজ বিপ্লব’ ও পানির স্তর রক্ষায় ড. আসাদুজ্জামানের কালজয়ী অবদান

বরেন্দ্রর ‘সবুজ বিপ্লব’ ও পানির স্তর রক্ষায় ড. আসাদুজ্জামানের কালজয়ী অবদান

আপডেট সময় : ০১:৩৭:১১ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

​মোঃ রবিউল ইসলাম মিনাল:গোদাগাড়ী রাজশাহী জেলা প্রতিনিধি:১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
​শুষ্ক ও অনুর্বর বরেন্দ্র ভূমিকে সুজলা-সুফলা জনপদে রূপান্তরের কারিগর, বিশিষ্ট কৃষি গবেষক এবং বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (BMDA) সাবেক চেয়ারম্যান মরহুম ড. এম. আসাদুজ্জামানের উদ্ভাবনী গবেষণায় বদলে গেছে উত্তরবঙ্গের কৃষি চিত্র। তাঁর প্রতিষ্ঠিত সংস্থা ‘সেন্টার ফর অ্যাকশন রিসার্চ-বরেন্দ্র’ (CARB) বর্তমানে তানোর, গোদাগাড়ী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিস্তীর্ণ এলাকায় ভূ-গর্ভস্থ পানির সুরক্ষা ও টেকসই কৃষি প্রসারে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে।
​পানির স্তর রক্ষায় ‘বরেন্দ্র মডেল’
ড. আসাদুজ্জামান লক্ষ্য করেছিলেন, অনিয়ন্ত্রিত ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে বরেন্দ্র অঞ্চলের পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যাচ্ছে। এই সংকট মোকাবিলায় তিনি ভূ-পরিস্থ পানির (Surface Water) ব্যবহার বৃদ্ধি এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ‘বরেন্দ্র মডেল’ প্রচার করেন। তাঁরই উদ্ভাবিত ‘প্রিপেইড মিটার’ ও ‘স্মার্ট কার্ড ভিত্তিক সেচ ব্যবস্থা’ আজ উত্তরবঙ্গের কৃষকদের সেচ খরচ কমিয়ে সাশ্রয়ী কৃষির পথ দেখিয়েছে।

২০১৫ সাল থেকে কার্ব-এর অধীনে ‘গ্রাউন্ড ওয়াটার মনিটরিং, রিসোর্স অ্যাসেসমেন্ট এন্ড ম্যানেজমেন্ট ইউনিট’ অত্যন্ত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহ করছে। বর্তমানে বরেন্দ্র অঞ্চলের ১৫টি উপজেলার ৩০টি শাখা অফিসের মাধ্যমে প্রতিদিন ভূ-গর্ভস্থ পানির স্থিতিশীল স্তর (Static Water Level) পরিমাপ করা হচ্ছে। এই উপাত্তগুলো আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক কেন রাস্টনের তত্ত্বাবধানে বিশ্লেষণ করে নিয়মিত আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশ করা হচ্ছে।

গোদাগাড়ীর আমতলীসহ বিভিন্ন ডেটা রেকর্ডিং স্টেশনের মাধ্যমে কার্ব যেসব কার্যক্রম পরিচালনা করছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
​গভীর নলকূপের সেচ কার্যক্রমের ফলে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তরের প্রভাব নির্ণয়।
​ফসলের নিবিড়তা ও বৈচিত্র্যতা পর্যবেক্ষণ করে কোন ফসলে কতটুকু পানি প্রয়োজন, সে বিষয়ে কৃষকদের সচেতন করা।
​মাটির ধরন অনুযায়ী উপযোগী ফসল চাষে উৎসাহ প্রদান।
​আবহাওয়া ও আর্দ্রতা পরিমাপের মাধ্যমে সেচ দেওয়ার ‘নিরাপদ পাম্পিং আওয়ার’ নির্ধারণ।

গোদাগাড়ী উপজেলার কেল্লাবারুইপাড়া গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া এই গবেষক বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও পরবর্তীতে পিএইচডি অর্জন করেন। তিনি সাবেক মন্ত্রী ব্যারিস্টার আমিনুল হক ও সাবেক আইজিপি ড. এনামুল হকের ভাই হওয়া সত্ত্বেও নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন বরেন্দ্রর মাটি ও মানুষের কল্যাণে। তাঁরই প্রচেষ্টায় আজ হাজার হাজার একর পতিত জমি ফলদ বাগানে ভরে উঠেছে।
​বর্তমানে ড. আসাদুজ্জামানের রেখে যাওয়া দর্শন ও ‘কার্ব’-এর হাল ধরেছেন সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আব্দুর রকিব এবং অন্যান্য প্রকৌশলীবৃন্দ। বিএমডিএ-এর সহযোগিতায় এই গবেষণা কার্যক্রম বরেন্দ্র অঞ্চলের পরিবেশ ও আর্থ-সামাজিক অবস্থা রক্ষায় এক অনন্য ঢাল হিসেবে কাজ করছে।
​স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে স্থানীয় কৃষকরা জানান, “ড. আসাদুজ্জামান আমাদের শুধু পানি ব্যবহারের নিয়মই শেখাননি, তিনি আমাদের মাটিকে ভালোবাসতে শিখিয়েছেন। তিনি নেই, কিন্তু তাঁর কাজের সুফল আমরা প্রতিদিন ভোগ করছি।
​বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষি ও পরিবেশ রক্ষায় ড. এম. আসাদুজ্জামানের এই অবদান ও ‘কার্ব’-এর চলমান গবেষণা আগামী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও টেকসই আবহাওয়া নিশ্চিত করবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

   রাজশাহী  প্রতিনিধি

মোঃ রবিউল ইসলাম মিনাল
01712483534