মিজানুর রহমান মিলন,
বগুড়া জেলা প্রতিনিধি :
বাংলাদেশ পুলিশের মেরুদণ্ড বলা হয় সাব-ইন্সপেক্টরদের । কিন্তু এই তাদের ক্যারিয়ার সারাজীবন পদোন্নতি বঞ্চিত । নিয়োগ কাঠামোয় বিদ্যমান আকাশ-পাতাল বৈষম্য আর দীর্ঘদিনের শোষণ ও বঞ্চনায় পুলিশের ক্যাডেট এস আই কর্মকর্তাদের মধ্যে চরম ক্ষোভ এবং অসন্তোষ বিরাজ করছে। ২৫-৩৫ বছরের সীমাহীন কষ্টের চাকুরী জীবন পার করেও অনেকের ভাগ্যে জুটছে না দ্বিতীয় পদোন্নতি। এই পরিস্থিতির কারণে মেধাবী তরুণরা পুলিশের ক্যাডেট এস আই হিসেবে যোগদান করে হতাশায় দিন কাটাচ্ছে। সরেজমিনে দেখা যায়, শিক্ষাজীবন শেষ করে ক্যাডেট এস আই হিসেবে যোগদান করে সবাই এখন দুঃখ প্রকাশ করেছে।
শিক্ষাগত যোগ্যতা সমান হওয়া সত্ত্বেও একই সময়ে বিসিএস করে এএসপি হিসেবে যোগদান করে কেউ ডিআইজি, কেউ এডিশনাল আইজি হয়েছেন। কিন্তু ক্যাডেট এস আই'দের ভাগ্য বদলায়নি।
পুলিশ রেগুলেশনস অব বেঙ্গল (পিআরবি) অনুযায়ী, পুলিশে নিয়োগ হয় তিন স্তরে—কনস্টেবল, সরাসরি এসআই এবং বিসিএস ক্যাডার সহকারী পুলিশ সুপার হিসেবে । তবে এই তিন স্তরের ক্যারিয়ারের পদোন্নতি বিশ্লেষণ করে দেখা যায় বিস্তর ব্যবধান।
পরিসংখ্যান বলছে, একই সময়ে চাকরিতে যোগদান করে ২৫-৩৫ বছরে একজন বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তা ৪ থেকে ৫টি পদোন্নতি পেয়ে ডিআইজি বা অতিরিক্ত আইজি হন। এমনকি একজন কনস্টেবলও বিভাগীয় পরীক্ষার মাধ্যমে ৪- ৫ টি পদোন্নতি পেয়ে পুলিশ পরিদর্শক বা এএসপি পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেন। অথচ সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত এসআইদের সিংহভাগই ২৫-৩৫ বছর সীমাহীন কষ্ট করে মাত্র একটি পদোন্নতি পেয়ে পরিদর্শক হিসেবেই অবসরে যাচ্ছেন। যদিও কেবলমাত্র উদাহরণ সৃষ্টির জন্য কতিপয় ক্যাডেট এস আই হতে পুলিশ পরিদর্শক পদোন্নতি পাওয়া পুলিশ পরিদর্শক চাকরি হতে অবসরে যাওয়ার আগ মুহুর্তে এএসপি হিসেবে পদোন্নতি দিয়ে বুক শীতল করার চেষ্টা করা হয়।
৩৩ তম ক্যাডেট এস আই ব্যাচের একজন কর্মকর্তা বলেন একই মেধা ও যোগ্যতা নিয়ে এসেও কাঠামোগত বৈষম্যের কারণে আমরা সারাজীবন মাঠেই পড়ে থাকছি। আমাদের সহপাঠীরা ক্যাডার সার্ভিসে এসে নীতিনির্ধারক হচ্ছেন, আর আমরা একটি পদোন্নতি পেতেই অর্ধেক জীবন পার করে দিচ্ছি। অথচ পুলিশ ডিপার্টমেন্টে আমরাই (ক্যাডেট এস আই) সর্বোচ্চ শ্রম দিয়ে থাকি। বিষয়টি এমন যেন, আমাদের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খাওয়াই ডিপার্টমেন্টের কাজ। ক্যাডার সার্ভিস পুলিশ অর্ডার করবে, যতো দায়ভার এস আই'দের। তিনি বলেন, একদিকে আদালতের কারনে অকারণে তলব অন্যদিকে বিসিএস পুলিশের হয়রানি, নিয়মিত দিন রাত ডিউটি, মামলা তদন্ত , অভিযোগ তদন্ত , জিডি তদন্ত, অপরাধ দমন, তথ্য সংগ্রহ, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা তামিল, রোলকল, বিটে গমন, দাঙ্গাদমন এসব করতে করতে ক্লান্ত নিজের জীবন। অধিকার, সংসার, পদোন্নতি এসব নিয়ে চিন্তার সময় পাই না।
পিএএল ভুক্তদের দীর্ঘ প্রতীক্ষা: মন্ত্রণালয় ও সদর দপ্তরের অনীহা:
মাঠপর্যায়ের তদন্তকারী ক্যাডেট এস আই কর্মকর্তাদের মধ্যে এখন বড় ক্ষোভের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে পিএএল । অভিযোগ উঠেছে, যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে পিএএল ভুক্ত সাব-ইন্সপেক্টরদের পদোন্নতি ক্যাডার সার্ভিস পুলিশ ও মন্ত্রনালয়ের প্রতিহিংসার কারনে ঝুলে আছে। পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যকার সমন্বয়হীনতা ও গাফিলতিকে এর জন্য দায়ী করছেন ভুক্তভোগীরা। গুরুত্বপূর্ণ মামলার তদন্তকারী এস আই কর্মকর্তাদের বঞ্চিত করায় মাঠপর্যায়ে কাজের স্পৃহা কমছে, যা পুরো বাহিনীর মেরুদণ্ডকে দুর্বল করে দিচ্ছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
পদোন্নতির কচ্ছপ গতি ও মানসিক যন্ত্রণাঃ
একজন এসআই ১২-১৫ বছরে একটি পদোন্নতি পেলেও একই সময়ে একজন কনস্টেবল পান দুটি এবং এএসপিরা পদোন্নতি পেয়ে এসপি হয়ে যান। সরকারি অন্যান্য বিভাগে পদোন্নতি ও গ্রেড সমন্বয়ের সুযোগ থাকলেও পুলিশের সরাসরি এসআইদের ক্ষেত্রে তা উপেক্ষিত। প্রায় ৯০ শতাংশ পুলিশ পরিদর্শক একই পদে থেকে অবসরে যান। ফলে পরিবার ও সামাজিকভাবে তারা চরম হেয় প্রতিপন্ন হচ্ছেন, যা তাদের পেশাদারিত্বে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
সুপার নিউমারারি’র বৈষম্য ও মেধাবীদের মোহভঙ্গঃ
ঊর্ধ্বতন ক্যাডার কর্মকর্তাদের পদোন্নতি নিশ্চিত করতে বিভিন্ন সময় সুপার নিউমারারি (সংখ্যাতিরিক্ত পদ) তৈরি করা হলেও মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের জন্য কোনো কার্যকর কাঠামো তৈরি হয়নি। দীর্ঘ ১৫-২০ বছর নবম গ্রেডে চাকরি করার পর যখন একজন পরিদর্শক এএসপি হওয়ার সুযোগ পান, ততদিনে তার চাকরির বয়স শেষ পর্যায়ে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের একজন শিক্ষার্থী জানান, আগে এসআই হওয়ার স্বপ্ন দেখতাম। কিন্তু পদোন্নতি, কাজের পরিধি ও সিনিয়রদের শোষণের বিষয়ে জানার পর আমার আগ্রহ হারিয়ে গেছে। মেধাবীদের এস আই তে না যাওয়াই ভাল। এই স্থবিরতা বজায় থাকলে বাহিনীতে পেশাগত শৈথিল্য ও দুর্নীতির ঝুঁকি বাড়বে।
সংকট উত্তরণে ৫ দফা সংস্কার প্রস্তাব:
পুলিশের এই অভ্যন্তরীণ সংকট নিরসনে বিশেষজ্ঞরা নিচের সমাধানগুলো জরুরি বলে মনে করছেন:
স্বয়ংক্রিয় উচ্চতর গ্রেড: বিসিএস ক্যাডারদের মতো সাব-ইন্সপেক্টরদের জন্যও নির্দিষ্ট সময় পর (৮ বা ১০ বছর) টাইম স্কেল বা উচ্চতর গ্রেড নিশ্চিত করা।
মাঠপর্যায়ে সুপার নিউমারারি পদ: পরিদর্শকদের জন্য এএসপি বা অতিরিক্ত এসপি পদে পর্যাপ্ত সংখ্যাতিরিক্ত পদ সৃষ্টি করা।
নতুন পদমর্যাদা সৃষ্টি: এসআই এবং ইন্সপেক্টর পদের মাঝে সিনিয়র সাব-ইন্সপেক্টর বা চীফ ইন্সপেক্টর এর মতো নতুন স্তর তৈরি করা।
পিএএল জট নিরসন: পিএএল ভুক্ত কর্মকর্তাদের পদোন্নতি প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করতে মন্ত্রণালয় ও সদরদপ্তরের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করা।
নিয়োগ কাঠামোর আমূল সংস্কার: ৩ স্তরের নিয়োগ প্রক্রিয়াকে ২ স্তরে নামিয়ে আনা, যাতে মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞরা দ্রুত নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেন।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পুলিশের এই দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত বৈষম্য ও পদোন্নতির জট দ্রুত নিরসন করা না গেলে বাহিনীর চেইন অব কমান্ড এবং জনসেবার মান ভেঙে পড়তে পারে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শীর্
সম্পাদক ও প্রকাশক: দেলোয়ার হোসেন সোহেল
বার্তা সম্পাদক: নরুল ইসলাম নয়ন
Copyright © 2024 দৈনিক আমার ভূমি-সত্যের পথে জনগণের সাথে. All rights reserved.